প্রজাপতিকাল
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী সচল হতে হলে আমাকে গড়পড়তা আরো সাড়ে তেইশখানা পোস্ট দিতে হবে। ব্লগর ব্লগর করতে আমার মহা উৎসাহ, কিন্তু সেটা নিজের ব্লগে, যেটা কেউ পড়বে না। :D কিন্তু সচলের মডূদের হাতে লেখা জমা দিয়ে পাস-ফেলে টেনশন করতে লেখার হাত সরে না। কিন্তু গত ক'দিন ধরে সম্প্রতি দেখা সিনেমাটা নিয়ে দু'টা কথা কিছু চিন্তাভাবনা বের হবার জন্য আকুলি বিকুলি করছে, তাই কীবোর্ডে আঙ্গুল ছুটালাম।
আমার একা সিনেমা দেখতে ভালো লাগে না। ইমনের সাথে বসে দেখলে সাম্প্রতিক জনপ্রিয় সিনেমাগুলাই চলে। সেদিন সেলাই এর ফ্রেম হাতে নিয়ে মনে হলো একটা সিনেমা দেখি। আমি আবার জলদস্যুগিরিতে খুবি কাঁচা, তাই কোথায় ফ্রী মুভি পাওয়া যায়, খুঁজতে ইচ্ছাও হলো না। হুলু,কম এ ঢুকে খুঁজতে লাগলাম। এ মা, সব দেখি হিন্দি ছবিতে সয়লাব! (এখানে বলে রাখি, "হুলু"তে অনেক আমেরিকান টিভি সিরিজ ও সিনেমা ফ্রী দেখা যায় যদি মাঝখানে ৩০ সেকেন্ডের ৪-৫টা বিজ্ঞাপন সহ্য করতে রাজি থাকেন - বাংলাদেশে কাজ করে কি না জানি না) হঠাৎ একটা ছবির পোস্টারে চোখ আটকালো, সালমা হায়েক আর মার্ক এন্থনি আছে, নামটা আগে শুনিনি কিন্তু ভালো লাগলো, " In the time of the butterflies" - প্রজাপতিকাল।
সিনেমার কাহিনী সত্য ঘটনা অবলম্বনে, পঞ্চাশের দশকে ডমিনিকান রিপাব্লিকের একনায়ক জেনারেল ত্রুহিয়ো (Rafael Trujillo) এর অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো তিন বোনের জীবনীকে উপপাদ্য করে লেখিকা জুলিয়া আলভারেজ যে কাহিনীটি লিখেছিলেন তার চিত্ররূপ। ছবি শুরু হয় মিরাবাল বোনদের উঠোন থেকে। বড় বোন মিনার্ভা পড়াশোনায় সবসময় আগ্রহী, মেঝ বোন পাত্রিয়া একদম ঘরোয়া, সেজ বোন যাকে ওরা আদর করে দেদে বলে ডাকে, তার মনটা বড়, সে যে মানবসেবায় আত্মনিবেদন করবে সেটা সবাই ধরে নিয়েছে, আর সবচে ছোট্টটি, মারিয়া তেরেসা, সংক্ষেপে মাতে হয়ত চুপচাপ, কিন্তু চোখে কিসের যেন ঝিলিক। খাবার টেবিলে বসে মিনু যখন শহরে পড়তে যাবার জন্য বাবাকে রাজি করায় তখন মাথার পিছে ঝুলে থাকা দামী ফ্রেমে বাঁধানো জেনারেল ত্রুহিয়োর ছবিটা যেন মিটমিটিয়ে হাসে।
শহরে মেয়েদের স্কুলে এসে ভর্তি হয় মিনু। পথে ট্রেনে শেকলে বাধা এক বন্দীর চোখের ভাষা সে পড়তে গিয়েও এড়িয়ে যায় অস্বস্তিতে। এতদিন বাবার ডানার আড়ালে থাকা মিনু একটু যেন আভাস পায় কিছু একটা গোলমেলে আছে, উড়ো শুনতে পায় যারা ত্রুহিয়োর বিরোধিতা করে, তারা নাকি সবার মাঝ থেকে হারিয়ে যায়, কিন্তু বিশ্বাস করতে পারে না। ছুটিতে বাড়ি এসে পরিচয় হয় শহর থেকে বেড়াতে আসা আইনের শিক্ষক লিওর (মার্ক এন্থনি) সাথে। মনের সাথে দেয়া নেয়া হয়ে যায় কম্যুনিস্ট চিন্তা চেতনা, নতুন করে সব কিছু দেখতে শেখে মিনার্ভা, আর মিনুর প্রানবন্ত চরিত্রের মাঝে লিও খুঁজে পায় এক প্রজাপতিকে, যে এখনো কোকুনের মাঝে বাড়ছে। ত্রুহিয়োর বাহিনীর হাত থেকে পালাতে গিয়ে যখন লিওর মৃত্যু হয় তখনি সে প্রজাপতি পাখা মেলে।
এর মাঝে মিনুকে লড়তে হয় ত্রুহিয়োর সাথে মেয়ে হয়ে আইন পড়ার অনুমতি আদায়ের জন্য, একনায়কের লালসা থেকে নিজের সম্মান আর বাবার জীবন বাঁচাতে। যখন আরেক আন্ডারগ্রাউন্ড কম্যুনিস্ট নেতা মানোলো তাকে জিজ্ঞেস করে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে তার একার যুদ্ধজয়ের গোপন রহস্য, মিনু হেসে জবাব দেয়, " আমি শয়তানের সাথে জুয়া খেলে জিতেছি। " মানোলোর সাথে সাথে মিনু সক্রিয়ভাবে বিপ্লবে জড়িয়ে পড়ে। বোনের সাথে দেখা করতে এসে মাতেও জড়িয়ে পড়ে আন্দোলনে। বিপ্লবীদের মাঝে তার আশার আলোর মত, লিওর দেয়া নামটিতেই তারা আপন করে নেয় এই দুই বোনকে, "Las Mariposas"- প্রজাপতি।
বাবার জীবনের বিনিময়ে মিনু জোগাড় করেছিল, আইন পড়ার অনুমতি। অনেক পথ পেরিয়ে যেদিন অবশেষে ডিগ্রী নেবার দিন, সবার সামনে ত্রুহিয়ো মিনার্ভা মিরাবালকে আইন এর ডিগ্রী দিতে অস্বীকার করলো। সেই মূহুর্তটিতে মিনু, তার বোনেরা আর তাদের নিভৃতচারী মা জেনারেল ত্রুহিয়োর দিকে যে আগুন দৃষ্টি বর্ষণ করেছিল, স্বৈরশাসকের বিদায় ঘন্টা ঐ মুহুর্তেই বেজে গেছে।
কিন্তু এরপর মিনু কেমন যেন হাল ছেড়ে দেয়, স্বামী সন্তান নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চায়, কিন্তু একসময় তার বিপ্লবের কমরেড দের একের পর এক কুকুরের মত গুলি করে মারতে থাকলে তারাও সশস্ত্র সংগ্রামের পথ খোঁজে। মেঝ বোন সব সময় সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবে আন্দোলনের বিরোধিতা করলেও এবার সেই অস্ত্রসহ বোনদেরকে আশ্রয় দেয়। এর পরের কাহিনীকে মিরাবাল বোন দের স্বামী সহ ত্রুহিয়োর কারাগারে অত্যাচারিত হওয়ার, তার মাঝেও সাধারন মানুষের গোপন সমর্থনে মনোবল জিইয়ে রাখার। শেষ একটা চাল চালতে জেনারেল ত্রুহিয়ো মিরাবালদের স্বামীদের আটকে রেখে বোনদেরকে মুক্তি দেন। স্বামীদেরকে মুক্তি দেয়ার শর্তে মিনার্ভাকে বাধ্য করান তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে যাতে জনগণের কাছে তার ইমেজ ক্ষুণ্ণ হয়। কিছুতেই মিনার্ভা মিরাবালকে দমাতে না পেরে অবশেষে তাকে গুপ্তহত্যার আশ্রয় নিতে হয়। ১৯৬০ সালের ২৫শে নভেম্বর কারাগারে আটক স্বামীদের সাথে দেখা করে ফেরার পথে মিনার্ভা, পাত্রিয়া আর মাতে মিরাবাল কে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, সংবাদপত্রে প্রচারিত হয় তাদের বহনকারী গাড়ি দুর্ঘটনা কবলিত হবার খবর, গাড়ি আর লাশ পাওয়া যায় পাহাড়ের পাদদেশে।
এর ছ'মাস পর জেনারেল ত্রুহিয়ো আততায়ীর হাতে নিহত হন। ১৯৯৯ সন থেকে ২৫শে নভেম্বর কে "আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন রোধ দিবস" হিসেবে পালন করা হয়।
সিনেমাটা দেখার পর তার সাথে কতগুলা ভাবনা চিন্তা যুক্ত হলো।
১. যেকোন আন্দোলনে নারী নেতৃত্বের ভূমিকা অপরিহার্য। শুধু রক্ত ঘাম, শ্লোগান, অস্ত্র এসব দিয়ে আন্দোলন হয় না। আন্দোলনের পিছে যে আবেগ প্রয়োজন তার অন্যতম জোগানদার নারী, আরো ভালো যদি সে হয় সহযোদ্ধা। ঘরের আরাম সুখের সংসার ছেড়ে একজন পুরুষ খালি রক্ত গরমের নেশায় কয়দিন আন্দোলন করবে, যদি ঘরনীর সায় না থাকে। ঘরের বাইরে আপনি দেশোদ্ধার করে ফিরলেন, বাড়িতে ফিরে স্ত্রী যদি খুন্তি হাতে ঝাড়ি দিতে আসে, ঘরে বাজার নাই বলে দেশোদ্ধারের আনন্দ কই উবে যাবে!! একজন জাহানারা ইমামের মত আরো কত মা, স্ত্রী প্রিয়জনদের বিদায় দিয়েছিল স্বাধীন দেশ নিয়ে আসার জন্য, আশ্রয়, খাদ্য, সম্ভ্রম দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আগলে রেখেছিল এই নারীরা বলেই আজ এই দেশ।
২. নারী নেতৃত্বের ইস্পাত কাঠিন্যও একটা লক্ষ্যনীয় ব্যাপার। যেমন ধরুন মতিয়া চৌধুরী, সত্তরের সেসব নেতাদের মাঝে অনেকেই নানারকম আপোষ করে মিইয়ে গেছেন। মতিয়া চৌধুরী এখনো সমানে দাপটে যাচ্ছেন। আমাদের দুই ফিক্সড প্রধানমন্ত্রী খালার কথাই ভাবি, বিশাল পারিবারিক বিপর্যয়ের পরও তারা দু'টি রাজনৈতিক দলের হাল ( সে যে হাওয়াতেই হোক না কেন) ধরে আছেন। হিলারী ক্লিন্টন, এঞ্জেলা মার্কার, জুলিয়া গিলার্ড এদের তো দেখলেই ভয় লাগে।
৩. সিনেমাতে জনগণকে স্বৈরশাসকের অপকর্ম সম্পর্কে জানানোর জন্য মিরাবাল বোনেরা বেছে নিয়েছিলো চার্চকে। চার্চের সাপ্তাহিক প্রার্থনার সময়টাতে যাজকেরা কথা বলতেন একনায়কের অন্যার অনাচার সমন্ধে। চার্চ বেছে নেয়ার কারণ ছিল যত ক্ষমতা শালীই হোক ধর্মের জায়গাটিতে আঘাত করতে পারবে না। বাংলাদেশে সাধারন অল্পশিক্ষিত, অশিক্ষিত মানুষকে যুদ্ধপরাধী, দেশদ্রোহী, দূর্নীতিবাজ সরকার সমন্ধে সচেতন করার খুব ভালো জায়গা হতে পারত জুম্মার নামাজের পর খুতবা পরবর্তী আলোচনায়। নবীজীর শিক্ষায় মসজিদে নামাজ পড়ার পিছনে সামাজিক যোগাযোগ ও সচেতনতাও কি একটা কারণ ছিলো না। কিন্তু হায়, আমাদের এই জায়গাটাই এখন নষ্টদের দখলে চলে গেছে/ যাচ্ছে। আমরা কি খুব বেশী অভাগা?
-শিশিরকণা-
(আমিহিমি@জিমেইল,কম)

