all that i see

Monday, August 13, 2012

লাল পাহাড়ের দেশে


    ডিসক্লেইমারঃ  এই পোস্টের কোন ছবি কোন রকম পোস্ট প্রসেসিং করা হয়নাই। 
    পায়ের তলায় সর্ষে অলা এক পর্যটকের ভয়ে আজকাল সচলে ভ্রমণ ব্লগ দিতে কলিজা লাগেডুপ্লিকেট পোস্ট হয়ে যায় কিনা এই আশংকায় অনেকদিন ধরে নিবিড় পর্যবেক্ষণের পরে ধারণা হইলউনার পাসপোর্টে সীল ছাপ্পরের বহর দেখে আম্রিকান সরকার নির্ঘাৎ তেনারে সন্ত্রাসী ঠাউরেছেএখনো এই ভু-খন্ডে পা দিতে পারেন নাই উনি পোস্ট দেবার সুযোগ পাবার আগেই তাই একখানা পোস্ট ঠুকে দেই এই বেলা ভেবে লেখার সাহস করলাম

    বর্ণনা শুরুর আগে একখানা গান দেখেন যারা MI-2 দেখে কেবল নায়িকার দেহ বল্লরী স্মরণে রেখেছেন তাদের স্মৃতি পরিষ্কার হবে নায়ক সাহেব সিনেমার শুরুতেই তার দুঃসাহস প্রমাণের জন্য প্রথমেই এক দুর্গম পাহাড়ের কানা ধরে ঝুলায়মান থেকে যে অপার্থিব দৃশ্য অবলোকন করেছিলেনসেই দৃশ্যাবলীই আপনাদের দেখাবোতবে কিনা অত উঁচু থেকে নয়,  মাটির কাছাকাছি  থেকে গানটা ছেড়ে দিয়ে স্ক্রল ডাউন করতে থাকুন



    আম্রিকা দেশটা মেলা বড়এক ধার থেকে আরেক ধার যাইতে যাইতে আকাশ বাতাস সময় সব পালটায় যায় হলিউড মুভি দেখলে মনে হয় আম্রিকা মানে নিউ-ইয়র্ক যেইখানে নানান কিসিমের ভিলেইন এটাক করেদালান কোঠা দিয়ে ভর্তি। কিন্তু প্রকৃতিক বৈচিত্র্যময় জায়গাও কম নাইযেইখানে খান-দানী ভিলেইনদের আনাগোনা কম ( এইজন্যই নায়ক সাহেব শান্তিতে ছুটি কাটাইতে এইসব জায়গায় ঝুলাঝুলি করতে যান) এই জায়গাটা হইল আম্রিকার উত্তর পশ্চিম দিকে চারটা রাজ্যব্যাপী। এরিজোনাইউটাহ,কলোরাডো আর নিউ মেক্সিকোর) চারটা কোনা এসে মিলেছে যে খানে সেই এলাকা জুড়ে এই আজব ভৌগলিক বিস্তার যদিও আর্চেস ন্যাশনাল পার্ক নামে পরিচিত যে জায়গাটা সবচে বেশি দর্শনীয় সেটা ইউটাহ এর অংশ লালপাথুরে মাটি সোজা আকাশ ফুড়ে উঠে গেছে গাছপালাহীন ধু ধু লাল প্রান্তরের মাঝে মাথায় ডান্ডা মেরে অজ্ঞান করে কাউকে  এনে ছেড়ে দিলে জ্ঞান ফিরে প্রথমেই মনে হবে বুঝি এলিয়েন এবডাকশন করে মঙ্গল গ্রহে এনে ফেলেছে দুইন্যার এইসব জায়গায় আসলে মনে হয়কেম্নে কী?


    সেপ্টেম্বরের কোন এক মেঘলা ভোরে 'বুলা'কে নিয়ে রওনা হলাম ইউটাহ এর দিকে। মাঠ ঘাট, পাহাড় পর্বত কত কিছু পেরিয়ে সল্ট লেক সিটিতে পৌছলাম সেটার বর্ণনা না হয় আরেক পোস্ট হবে, দু'দিন এদিক সেদিক ঘুরে এই পথ ধরে এসে হাজির হলাম আর্চেস ন্যাশনাল পার্কে।


    এরপর শুরু হলো পাহাড় গা বেয়ে একে বেকে উঠে যাওয়া পথে গাড়ি নিয়ে।






     ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে কখন যে চোয়াল ঝুলে পড়ে হুঁশ থাকে না। এদিকে তাকাতে গেলে আরেকদিকে কিছু একটা চোখের কোণা দিয়ে মিস হয়ে যায়। তাই এই জায়গাটা দেখে গাড়ি থামিয়ে নামতেই হলো।
    এই জায়গাটার নাম দেয়া হয়েছে পার্ক এভেন্যু। মাঝ দিয়ে চলে গেছে একটা পায়ে চলা পথ। চাইলে ঐ পথে হেটে পার্ক এভেন্যু পার হওয়া যায়, অলস বাঙালি বলে ঐ পথে পা বাড়ানো হলো না, তাছাড়া ম্যাপ বলছে তখনো পার্কের সিকি ভাগও দেখা হয়নি।


    এই খাড়া দেয়াল কোন মানুষের হাত ছাড়া প্রকৃতি বানিয়েছে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। দুই দিকে স্কাই স্ক্র্যাপারের সমান উচ্চতায় মাথা তুলে থাকা এইসব প্রাকৃতিক স্থাপনা দেখলে মনে হতেই পারে যে বুঝি পার্ক অ্যাভেন্যু দিয়ে যাচ্ছি। সারদিন এক খানে বসে কাঁটিয়ে দিতে ইচ্ছে করলেও উঠে রওনা দিতেই দেখা হলো এক স্থানীয় বাসিন্দার সাথে।




    একটু এগোতেই চোখে পড়ল ঝগড়ারত তিন কুটনী মহিলার উপর।


    ঐ পাথর টা ঐ মাথায় গেলই বা কিভাবে আর ভারসাম্য বজাইয় রেখে আছেই বা কিভাবে। ওর পাশ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যেতে যেতে সতর্ক চোখ রাখি কোনটা গড়িয়ে পড়ে কি না এই ভয়ে।







    এইরকম কেবল একটা দুইটা না, যেদিকেই তাকিয়ে অবিশ্বাস্য সব ভারসাম্যের খেলা। পার্কের অন্যতম বিখ্যাত পাথরেরে নাম "ব্যালান্সড রক"। প্রায় ৫৫ ফুট উচু এই পাথর কোনরকমে দাঁড়িয়ে আছে সরু একটা স্তম্ভের উপর।
    একটু গুতা টুতা দিয়ে দেখলাম নড়ানো যায় কি না।



    বেশি একটা লাভ হইলো না। মানুষের সাথে তুলনা করলে বুঝা যায় পাথরটা কত্ত বড়।


    এইখানে খাওন কয় ছবি তুলার পর আবার আগানো শুরু হইল, উদ্দেশ্য ডাবল উইন্ডো নামের আর্চ দেখা। রাস্তা থেকেই দূরে তার নিশানা দেখা গেল। 

     কিন্তু ম্যাপ বললো কাছে গিয়ে দেখতে হলে হাটতে হবে মাইল দুয়েকের মতো। সময়ের অভাবে তাই লোভ সামলে ক্যমেরা জুম করে দুধের সাধ ঘোলে মেটাতে হলো।

    এভাবেই দেখে নিলাম আরো কয়েকটা আর্চ। 
     আরো কত যে ভালো করে দেখা বাকি রয়ে গেল।


    আফসোস ভুলে তাড়াতাড়ি চললাম, যেটা দেখতে এতদূর এসেছি সেই বিখ্যাত ডেলিকেট আর্চের দিকে। একদম পাহাড়ের কানায় কোন রকম সাপোর্ট ছাড়া একাকী দাঁড়িয়ে আছে এই আর্চ। যেখানে গাড়ি পার্ক করা যায় সেখান থেকে এক চিমটি দেখা গেল এইরকম।

    কিন্তু এইটুকু তে কি আর মন ভরে, তাই ভর দুপুরের রোদ মাথায় করে পা বাড়লামা ১।৫ মাইলের হাইকিং ট্রেইলে। ট্রেইলের গোড়াতেই একটা ধ্বসে পড়া কেবিন, সাথে সাইনবোর্ডে লেখা "ওলফ র‍্যাঞ্চ", এই এলাকায় প্রথম বসতি স্থাপন করা পরিবার।
     এই ঘোলা পানির উৎস ভরসা করে ছেলে পিলে নিয়ে বসতি গেড়েছিল এরা।
    পাহাড়ের ঢাল বেয়ে যে যেমন খুশি ঊথে যাচ্ছে, তবে তার মাঝেও সহজ পথ চিনিয়ে দেয়ার জন্য পার্ক রেঞ্জাররা পাথর সাজিয়ে ট্রেইল চিহ্নিত করে রেখেছে।

     সাইনবোর্ড বসিইয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশটা নষ্ট করেনি বলে ভালো লাগলো। এই পাথরের স্তূপকে যে "কেয়ার্ন" বলা হয় সেটাও জানলাম, যদিও এটা শোনার পর থেকে খালি নিউজি ল্যান্ডের হেঞ্ছাম ক্রিকেটার ক্রিস কেয়ার্নের কথা মনে পড়ছিলো খালি।


    উঠার পথে আরেক স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে দেখা হল। নাম ক্যাঙ্গারু র‍্যাট। কাঠবিড়ালি জাতের এই ইদুর পানি ছাড়াই বেচে থাকতে পারে এই উষর মরুতে। শিকড় বাকড় পাতা এসব অন্যান্য খাবার থেকেই সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় পানি। 

     পথে উঠতে উঠতে আরও চোখে পড়লো পাহাড়ের গায়ে সৃষ্টি হওয়া কিছু গুহা। ওয়েস্টার্ন কাহিনীর বিখ্যাত বুচ ক্যাসিডী আর সান্ড্যান্স কিডের আস্তানা ছিলো এইসব গুহা। কাছে পিঠে ট্রেইন ডাকাতি করে এসে এই গুহায় একবার গা ঢাকা দিলে কোন শেরিফের বাপের সাধ্য এই ভুল ভুলাইয়া থাকে খুঁজে বের করে।


    অবশেষে পা ফেললাম পাহাড়ের মাথায়। একটা বাঁক ঘুরতেই দেখা মিললো ডেলিকেট আর্চ নামের এই বিখ্যাত প্রাকৃতিক আশ্চর্যের উপর। মানুষ যতই কল্পনা করুক না কেন, প্রকৃতি সব সময়ই সেই কল্পনাকে ছাড়িয়ে যায়। 



    আর্চের ঠিক নিচেই নেমে গেছে খাড়া পাহাড়ের ঢাল। প্রতিনিয়ত ভাঙ্গা গড়ার খেলায় ব্যস্ত এই ভূ-স্বর্গে এখনো দাঁড়িয়ে থাকা এই তোরনটি আর ক'দিন থাকবে তা বলা যায় না। তবু প্রতি বছর তোরণের মাথার উপরের ঐ সমান্তরাল অংশের খাঁজে খাঁজে পাখিরা বাসা বাধে। পড়ন্ত বিকেলের আলোয় সমস্ত লালীমা গায়ে মেখে পর্যটকদের ক্যামেরায় ধরা পড়ে ডেলিকেট আর্চ। ক্যামেরার লেন্স যে এখনো মানুষের চোখের সমান হতে পারেনি সেই উপলব্ধি থেকে একে একে পর্যটকেরা এই অপার্থিব সৌন্দর্যকে পিক্সেলে বন্দী করার আশা বাদ দেয়। মেঘ ফুড়ে আসা সূর্যের আলোয় বিছানো নীলচে সবুজ পাহাড়ের কোলে লাল পাথরের ভাস্কর্যের দিকে তাকিয়ে এই মানব জীবন নিয়ে গভীর ভাবনা হয়ত আচ্ছন্ন করে মনকে। হঠাৎই নীরবতা গ্রাস করে পাহাড়চূড়ায় জড় হওয়া মুখরিত মানুষগুলোকে।  






    বিশ্রামের ফাকে কেউ খুলে বসে খাবারের প্যাকেট, আর তাইতে গন্ধ শুকে হাজির হয় দু চারটে ক্যাঙ্গারু র‍্যাট।


    ছটফটে আর অসম্ভব কিউট চেহারার প্রানীগুলোর কয়েকটা ছবি তুলে ফেলি চটপট। তারপর ফিরতি পথ ধরি।




    নীল সবুজের এই পৃথিবীর মধ্যে এইরকম আজব মঙ্গল গ্রহ মার্কা জায়গা কিভাবে তৈরি হল? প্রায় ৩০ কোটি বছর আগে কলোরাডো নদীর অববাহিকায় এই জায়গা ছিল সমুদ্রের পানির নিচে। একসময় সমুদ্র সরে গেল, পানি শুকিয়ে গিয়ে পড়ে রইলো লবন আর বালির আস্তর। তারপর একসময় আবার সমুদ্র এগিয়ে এসে ডুবিয়ে দিল এই জায়গাটা, আবার সরে গেল। এইভাবে এক দু'বার নয় ঊনত্রিশবার সমুদ্রের আসা যাওয়া চললো, আর প্রতিবারে রেখে গেল, শুকনো লবনের আস্তরণ, হাজার হাজার ফুট গভীর। এরপর প্রায় পনের কোটি বছর আগে শেষবার সমুদ্র মিলিয়ে যাবার পর থেকে এখানে এসে জমা হতে লাগলো কলোরাডো নদীর বয়ে নিয়ে আসা পলি আর পাথর। একসময় পুরো জায়গাটাই ঢেকে গেলো লাল বেলেপাথরেরে নিচে। কিন্তু পাথরের চে যেহেতু লবনের ঘন্ত্ব অনেক কম, এই ভার নিতে পারলো না নিচের লবনের স্তর, ধ্বসে পড়লো জায়গায়। এভাবেই প্রায় পনের কোটি বছর আগে তৈরি হলো টিলা আর উপত্যকা আর মালভূমি গুলি আর উপরের পাথরের স্তর গুলো সময়ের সাথে তৈরি করলো এই অন্য দুনিয়া। লালা বেলে পাথরের কারনেই আজব সব আকার আকৃতিতে মাথা উচিয়ে ভুপ্রাকৃতিক গঠণগুলোকে মঙ্গল গ্রহের সাদৃশ্যিক মনে হয়।
    লবনের স্তর ধ্বসে পড়ার পর এবার খেল দেখানো শুরু করলো বৃষ্টি আর বাতাস। যদিও এই এলাকায় বৃষ্টি হয় কালে-ভদ্রে, কিন্তু যখন হয় তখন শুকনো মাটি সাৎ করে শুষে নেয় সব পানি। ভু_গর্ভস্থ পানিতে ধীরে ধীরে গলে ক্ষয় হয়ে যায় নিচের লবনের স্তর। ফলে জায়গায় জায়গায় আবার ধ্বসে পড়ে বেলেপাথরের স্তূপ এবং পাখানার মতো সরু সরু শৈল শিরা উপশিরা তৈরি হয়। বাতাসে ক্ষয় হতে থাকে এই সব পাথরেরে দেয়ালের নিচের অংশগুলো, কোথাও কোথাঅ উপরে বীমের মতো অংশ আস্ত রেখেই নিচের পাথর আর বালি ধ্বসে পড়ে। এভাবেই তৈরি হয় এক একটি তোরণ বা আর্চ। আরও ভালো ভাবে জানতে হলে দেখুন ডিস্কভারি চ্যানেলের তৈরি এই ডকুমেন্টারি টি। 

    ইউটাহ স্টেটেরে মোঅ্যাব শহরেরে কাছাকাছি এই ন্যাশনাল পার্কে এমন তোরণের সংখ্যা ২০০০ এর উপরে।  মানুষ গলে যাবার সমান ফোকড় না হলে তোরণ বলে ধরাই হয় না, কাজেই ছোটখাট তোরণ বা জানালা হিসেবে ধরলে সংখ্যা আরো অনেক বেশি হবে। যেটা মজার ব্যাপার আজকে যেটা ছোট জানালার ফোকড় মনে হচ্ছী, কাল কিন্তু সেটাই বিশাল তোরণে পরিণত হতে পারে। কখন যে পাথর বালি ধ্বসে পড়ে এই তোরণ তৈরি হবে, তা বলার কোন উপায় নেই, কারন এমনটা হর হামেশাই ঘটে এখানে। অনেক আর্চই মানুষের জানা সময়ের মধ্যে ভেঙ্গে পড়ে বিলীন হয়ে গেছে, তেমনি তৈরি হয়েছে নতুন আর্চ। এই ইউটিউবের যুগে একদল টুরিস্টের উপস্থিতিতে ভিডিও ক্যামেরার সামনেই ভেঙ্গে পড়ে বিখ্যাত ল্যান্ডস্কেপ আর্চের এক অংশ। 

    এই জায়গাটাকে ভিন গ্রহ মনে হবার আরেকটা কারণ হলো, এখানের মাটির রঙ। উচু পাহাড় গুলি লাল রঙের হলেও অনেক জায়গার মাটিই সবজে- নীল রঙের। কেন? সেই যে সমুদ্রের আসা যাওয়া চলেছিল এই মাটির উপর দিয়ে তখন এখানে  তারা রেখে গিয়েছে সবুজ- নীল রঙের সায়ানো ব্যাক্টেরিয়া। এই অনুজীব গুলো মাটি কামড়ে পড়ে থেকে বংশ বিস্তার করে এই রুক্ষ এলাকায়। এই প্রজাতিটিকে রক্ষা করার জন্য পার্কে নির্ধারিত রাস্তা ছাড়া বাকি জায়গায় পা না ফেলতে অনুরোধ করা হয় পর্যটকদের। কারন একবার পায়ের নিচে পিষে  গেলে প্রায় হাজার বছর লাগে  ব্যকটেরিয়ার কলোনি পুনর্গঠন করতে। তবে এই কারনে এই ব্যাক্টেরিয়ার স্তরের মাঝে লেখা হয়ে যায় হাজার বছরের ইতিহাস।

    সকল ছবির আলোকচিত্রীঃ আশরাফ ইসলাম (ইমন)। 
    শেষ একটা ছবি, "বুলা" র। আমাদের দুজনের নিরুদ্দেশ ঘুরাঘুরির সঙ্গী।

0 Comments:

Post a Comment

<< Home