এসো বিজয়ের গল্প বলি
আমরা কেবলই ভুলে যেতে চাই আমাদের অতীত। যারা একাত্তরের সেই গৌরবময় অধ্যায়ের নায়ক তারাও আজ অভিমান করে ভুলে যেতে চান ঐ বছরটিকে। ঐ একটি বছর
এখন আর তাদের গৌরবের আত্মত্যাগের গল্পগাথা নয়, ঐ বছরটির দুঃখের স্মৃতি গুলোই কেবল
তাদের মনে দগদগে ক্ষতের মতো জেগে থাকে। গর্বিত হবার অধিকার এখনকার পা চাটা
রাজনীতিক আর রাজাকারের দল তাদের থেকে ৪০ বছরে একটু একটু করে কেড়ে নিয়েছে। নতুন
প্রজন্মের কাছে ১৯৭১ কেবলই পরীক্ষার সিলেবাসে ইতিহাস বইয়ের কিছু পাতা আর
পরিসংখ্যান মাত্র। এহেন প্রজন্ম যদি আজ ভারত, কাল পাকিস্তানের লেজ ধরে নাচানাচি
করে তবে অবাক হবার কিছু নেই। আমরা তো তাদের নিজ দেশের জন্য গর্বিত হবার সেই
অনুভূতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেইনি। আমরা তো তাদেরকে কখনো ইতিহাসের সেই সব বীভৎস মূহুর্তগুলোর
মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেইনি, যে একজন পাকিস্তানকে ভাই বলে বুকে জড়িয়ে ধরার আগে
একবার অন্তত বুক কেঁপে উঠবে। সচল, ICSF, ফেসবুকে অনেকগুলো গ্রুপ আরো অনেকে ১৯৭১ এর তথ্য প্রমাণ, ভুল তথ্যের
ব্যাবচ্ছেদ করতে অত্যন্ত সচেষ্ট। কিন্তু দিন শেষে, একজন মানুষ হয় কারন, তার মন
আছে। তথ্য প্রমাণ দিয়ে মানুষের মনে ভালবাসা সৃষ্টি করা যায় না। এটা সম্পূর্নই
অনুভবের ব্যাপার। যুক্তি-পরিসংখ্যান যাই বলুক, যেদিন বাংলাদেশ ক্রিকেট দল জিতে
সেদিন সব ভুলে আমরা দেশকে ভালবাসি, প্রতিপক্ষ হোক না কাগজে কলমে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন
বা র্যাংকিং-এ ১ নম্বর। ছোট ছোট বিজয়ে আমরা আপ্লুত হয়ে যাই, বিরাট প্রতিপক্ষকে
শুইয়ে দেয়ার আনন্দে আত্মহারা হই। কিন্তু এ তো নতুন কিছু নয়। এই তো আমাদের জাত,
আমরা ভুলে যাই ভবিতব্যের বিরুদ্ধে আমাদের সবচে' বড় জয়ের কথা। ১৯৭১ এ কি ঠুনকো
খেলনা সব অস্ত্র দিয়ে আমরা বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর একটা সেনাবাহিনীকে স্রেফ নেংটো
করে ছেড়ে দিয়েছিলাম। সেই জয়ে কেবল ১১ জন বীর সেনানী ছিল না, ছিলাম আমরা সবাই,
আমাদের বাবা মা, দাদা নানা, চাচা মামারা সবাই সেই সময়টা যার যার অবস্থানে থেকে যার
যার মতো লড়েছেন। সেই বিজয়ীর জিন আমরাও আমাদের রক্তে বহন করে চলেছি। আমরা নিজেদের
নিয়ে গর্বিত নই কেন?
কারন, আমরা
জানিই না, যে আমাদেরও গর্বিত হওয়ার মতো অনেক কাহিনী আছে। সেসব কাহিনী খুঁজতে
আপনাকে মুক্তিযুদ্ধের দলিল ঘাটতে হবে না। প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি পরিবারে লুকিয়ে আছে
অসংখ্য গল্প, আনন্দ-বেদনার, শঙ্কা-অপেক্ষার, গর্বের-ক্রোধের। হয়ত ছিটেফোটা কখনো
কানেও এসেছে, কিন্তু পুরোটা কখনো শোনা হয়নি মনে দিয়ে। সেই সময়টা যারা পার করে
এসেছেন, বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধারা, তারা আরও অনেক বেশি অভিমানী আজ, সরকার বা দেশ
তাদের মূল্যায়ন করেনি, সম্মান করেনি, তারা আজ প্রাণপনে ভুলে যেতেন যৌবনের উচ্ছাসে
দেশকে নিঃশর্ত ভালবেসে ফেলার ভুলটুকু। আজ ৪২ বছর হয়ে গেল, অভিমান বুকে চেপে রেখে
রেখে এই মানুষগুলো এখন একজন দু'জন করে হারিয়ে যাচ্ছেন। আমাদেরকে, বর্তমান
প্রজন্মের জন্য অনেক প্রশ্ন আর ইতিহাসের পাতায় অনেকগুলো ফাকা পৃষ্ঠা রেখে। তারা
সবাই হারিয়ে যাবার আগেই কি তাদের বুকে গোপনে লুকিয়ে রাখা গল্প গুলো সযত্নে আমাদের
সংগ্রহ করে রাখা উচিত নয়? এর পরে যে প্রজন্ম আসবে তাদেরকে শোনাবার জন্য হলেও এইসব
গল্প প্রতিটি পরিবারে সংগ্রহ করে রাখা প্রয়োজন। একটা পিচ্চি চোখ গোলগোল করে গল্প
শুনছে, " জানিস তোর দাদা না যুদ্ধের সময় এইরকম বুদ্ধি করে এতগুলা শ্ত্রু
সৈন্যকে হারিয়ে দিয়েছিল..." ভাবতেই তো কত ভাল লাগে। সত্য কাহিনীর যখন অনেক
দূরের অপরিচিত কেউ না হয়ে অতি চেনা প্রিয়জন কেউ হয়, তবে আবেদন হয় অন্যরকম, মনে দাগ
কাটে অনেক গভীরভাবে। ঘরের মাঝে অবিশ্বাস্য সত্য ঘটনা ঝুলি থাকতে বাইরে তাকানো কেন
বাপু?
কিন্তু এই
এত্ত এত্ত গল্প সংগ্রহ করবে কে? কেন? আমরাই করব! জিজ্ঞেস করছেন, কীভাবে? এইখানে
একটা ব্যাক্তিগত ঘটনা বলি। ক্লাস এইটে পড়ি তখন, বছর শুরু হয়ে গেলেও বোর্ডের বই
তখনও হাতে আসতে মাসখানেক দেরি। ছাত্র ছাত্রীদেরকে ব্যাস্ত রাখতে সমাজ বিজ্ঞানের
শিক্ষিকা আমাদের একতা বছর ব্যাপী প্রজেক্ট ধরিয়ে দিলেন। বছরশেষে এর জন্য ১০টা
নম্বর বোনাস পাওয়া যাবে। এম্নিতেই সমাজ বিজ্ঞানে নাম্বার উঠে না, বোনাস নাম্বারের
লোভে আমরা ঝাপিয়ে পড়লাম। প্রজেক্ট টা ছিল, ১৯৫২-১৯৭১ পর্জন্ত বাংলাদেশের ইতিহাস
সমন্ধে ছবি, পেপার কাটিং, যা পাওয়া যায় সংগ্রহ করে একটা স্ক্র্যাপ বুক বানাতে হবে।
তখনও ইন্টেরনেট এদেশে আসেনি। সারা বছর পেপারে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক যেকোন লেখা ছবি
খুঁটিয়ে পড়তাম, ছবি কেটে রাখতাম, বাবা মাকে জ্বালাতাম, আরো পত্রিকা এনে দেওয়ার
জন্য। স্রেফ দশটা নাম্বারের জন্য সমাজ শিক্ষিকা আমার ভিতরের আর বাইরের চোখ পালটে
দিলেন। সেই যে বাংলাদেশের ইতিহাস খোজার একটা স্বভাব তৈরি হলো, সেটা এখনো ছাড়তে
পারিনি। আগের কথা মনে নেই, কিন্তু এর আগে পত্রিকায় যখন এসব ছবি দেখেছি বীভৎসতা
সইতে না পেরে প্রায়ই চোখ ফিরিয়ে নিয়েছি, কিন্তু যখন নিজে খুজতে লাগি, তখন
ফেব্রুয়ারির রোদে রাস্তায় গড়িয়ে পরা রফিকের মাথার ঘিলু আমার আত্মায় আঘাত করে,
কুকুরের মুখে মৃত শিশুর দেহ দেখে পাক সেনাদের পিশাচ মনে হতে থাকে, বুকে মাইন বাধা
আমার বয়সী কিশোরকে দেখে তার সাহসে মুগ্ধ হয়ে ঐ লুঙ্গি পরা খালি গা বালকের প্রেমে
পড়ে যাই। জোর করে ইতিহাস গেলানো নয়, যখন ইতিহাস খুঁজে বের করতে প্রলুদ্ধ করা হইয়,
তখন পুরো ইতিহাস আমার চোখের সামনে সাদা কালো থেকে রঙ্গিন হয়ে উঠে। দেশকে নিয়ে
উপলক্ক্য ছাড়াই গর্বিত বোধ করতে পারি।


0 Comments:
Post a Comment
<< Home